একা বিদেশযাত্রায় নারীদের হেনস্তা ও ইমিগ্রেশনে বাধার ঘটনায় হাইকোর্টের রুল

নিজস্ব প্রতিবেদক: বৈধ পাসপোর্ট, টিকিট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও একা বিদেশগামী নারীদের ইমিগ্রেশন কাউন্টারে নানা বিব্রতকর প্রশ্ন ও বাধার মুখে পড়ার ঘটনা নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। সম্প্রতি নেপাল যাওয়ার পথে তিন অবিবাহিত তরুণীকে কোনো আইনগত কারণ ছাড়াই ইমিগ্রেশন থেকে আটকে দেওয়ার ঘটনার পর বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনা শুরু হয়েছে। এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে ভুক্তভোগী নারীদের করা রিটের প্রাথমিক শুনানি শেষে গত মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬) হাইকোর্ট রুলসহ আদেশ দিয়েছেন।
হাইকোর্টের রুল ও রিট আবেদনকারীদের বক্তব্য
দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও নওগাঁর ওই তিন তরুণী ৮ আগস্ট নেপাল যাওয়ার উদ্দেশ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান। তাঁদের কাছে বৈধ টিকিট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র থাকা সত্ত্বেও ইমিগ্রেশন পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল্লাহ তাঁদের বিদেশযাত্রার অনুমতি দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং কোনো লিখিত নোটিশ বা আইনি কারণ জানাননি।
এই ঘটনার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে তিন নারী হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন। রিটের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ইশরাত হাসান। শুনানির পর আদালত জানতে চেয়েছেন—প্রাপ্তবয়স্ক নারী নাগরিকদের বৈধ বিদেশযাত্রায় শুধু অবিবাহিত হওয়া, অভিভাবক ছাড়া ভ্রমণ বা অনুরূপ লিঙ্গভিত্তিক বিবেচনায় বাধা না দিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যথাযথ নির্দেশনা প্রণয়ন ও জারির নির্দেশ কেন দেওয়া হবে না।
আদালতের এই পদক্ষেপে নারীদের চলাফেরার স্বাধীনতা, ব্যক্তিস্বাধীনতা এবং সংবিধানের ২৭ ও ২৮ অনুচ্ছেদের সমতা ও লিঙ্গবৈষম্যবিরোধী অধিকারের প্রশ্নটি নতুন করে সামনে এসেছে।
নারীদের দীর্ঘদিনের হয়রানির অভিজ্ঞতা
তিন তরুণীর এই ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন মহলে নারীদের একা বিদেশ ভ্রমণের নানা তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা উঠে আসছে। জেন্ডার বিশ্লেষক সাবিনা পারভীন জানান, পারিবারিক অনুষ্ঠানে নেপাল যাওয়ার সময় তাঁর সঙ্গে থাকা ৫২ বছর বয়সী এক নারীকে কেবল পরিবারের সদস্য না হওয়ার কারণে ইমিগ্রেশনে আটকে দেওয়া হয়েছিল।
রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম নেটওয়ার্ক ফর পিপলস অ্যাকশনের (এনপিএ) মুখপাত্র ও অধিকারকর্মী ফেরদৌস আরা রুমী জানান, কর্মশালায় যাওয়ার সময় এক সহকর্মীকে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা প্রশ্ন করেছিলেন, তিনি বিদেশ যাচ্ছেন তা স্বামী জানেন কি না! এমনকি স্বামীর ফোন নম্বর নিয়ে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা নিজে ফোন করে তা নিশ্চিত হয়েছিলেন। এছাড়া অনেক নারী সাংবাদিক ও চাকরিজীবী একা বিদেশ ভ্রমণে যাওয়ার সময় পাসপোর্টে বৈধ পেশা ও সিল থাকা সত্ত্বেও এ ধরনের মানসিক হেনস্তা ও কুরুচিপূর্ণ প্রথার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেছেন।
মানব পাচারের আড়ালে পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা?
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, নেপালকে মানব পাচারের রুট হিসেবে ব্যবহার করার আন্তর্জাতিক সতর্কবার্তা এবং অন অ্যারাইভাল ভিসার সুযোগ থাকায় বিমানবন্দরে কড়াকড়ি করা হয়। কাগজপত্র সন্দেহজনক মনে হলেই যাত্রীদের আটকে দেওয়া হয় বলে তাদের দাবি।
তবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক তানিয়া হক মনে করেন, মানব পাচার রোধে যাচাই-বাছাই জরুরি হলেও কোনো অপরাধমূলক প্রমাণ ছাড়া শুধু সন্দেহের বশে প্রাপ্তবয়স্ক নারীদের বিদেশযাত্রায় বাধা দেওয়ার কোনো যৌক্তিকতা নেই। অধিকারকর্মী ও গবেষকদের মতে, সমাজে নারী ও পুরুষের সমান অধিকারের অভাব এবং পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতার কারণেই ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা নারীদের স্বাধীন সত্তাকে অস্বীকার করে এ ধরনের আচরণকে স্বাভাবিক মনে করেন।
— অপরাধ উন্মোচন প্রতিবেদন
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
মোট ০ প্রতিক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া জানাতে সাইন ইন করুন।
দিনের সেরা সংবাদ ইমেইলে পান
যেকোনো সময় ১-ক্লিকে আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।

মন্তব্য (০)
মন্তব্য করতে সাইন ইন প্রয়োজন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।