ধামরাই ইউএনও কার্যালয়ে কম্পিউটার অপারেটর শামীমের অনিয়মের অভিযোগ আতঙ্কে সেবাপ্রার্থীরা

(বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন — প্রথম পর্ব)
বিশেষ প্রতিনিধি:
ঢাকার ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে সাধারণ মানুষের সেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট মুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। জুলাইয়ের ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে যখন রাষ্ট্র সংস্কারের জোয়ার বইছে, ঠিক তখনই ধামরাই ইউএনও কার্যালয়কে ঘিরে গড়ে ওঠা এক শক্তিশালী দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটের অরাজকতায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। অফিসের সাধারণ কম্পিউটার অপারেটর শামীম হোসেন এবং তার গড়ে তোলা এই ‘শামীম গং’-এর কাছে কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছে পুরো ধামরাই।
একটি সরকারি দপ্তরের সাধারণ ৩য় শ্রেণীর কর্মচারী হয়েও শামীম কীভাবে তার পুরো চক্র নিয়ে গোটা উপজেলা জুড়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে এবং এই সীমাহীন দুর্নীতির শেষ ঠিক কোথায়—এখন এটাই ধামরাইয়ের সচেতন মহলের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
মাঝির ছেলে থেকে কোটিপতি: ক্ষমতার নেপথ্যে অদৃশ্য খুঁটি
হাজিপুর গ্রামের এক সাধারণ নৌকার মাঝির ছেলে শামীম হোসেন। একসময় অতি সাধারণ জীবনযাপন করা শামীম ধামরাই ইউএনও অফিসে যোগদানের পর যেন রূপকথার মতো বদলে যেতে শুরু করেন। বিগত ১০ বছর ধরে একই স্থানে কর্মরত থেকে ক্ষমতার অপব্যবহার, বদলি বাণিজ্য, চাঁদাবাজি এবং প্রতারণার মাধ্যমে আজ তিনি কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদের সময় তৎকালীন প্রভাবশালী নেতাদের মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে বদলি বাতিল করিয়ে পুনরায় ধামরাইয়ে জেঁকে বসেন শামীম। আর বর্তমানে পটপরিবর্তনের পর রাতারাতি ভোল পাল্টে প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে শামীম গং পূর্বের চেয়েও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
শামীম গংয়ের জালিয়াতি: প্রতারণার অভিনব কৌশল
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই সিন্ডিকেটের মূল কাজই হলো সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে টাকা হাতিয়ে নেওয়া। মাঠ পর্যায়ে শামীম ও তার সহযোগীদের প্রতারণার ধরণগুলো চোখ কপালে তোলার মতো:
ছদ্মবেশ ধারণ: সাধারণ মানুষের কাছে শামীম ও তার চক্রের সদস্যরা কখনো নিজেদের ‘ইউএনও’, কখনো ‘পেশকার’ আবার কখনো ‘উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা’ পরিচয় দিয়ে বিভ্রান্ত করে থাকে।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের ভয় ও চাঁদাবাজি: ধামরাইয়ের বিভিন্ন ইটভাটা ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে ইউএনও’র অভিযানের ভয় দেখিয়ে লাখ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করে শামীম। আর এই কাজে তার বিশ্বস্ত ক্যাডার ও সিন্ডিকেটের সদস্যরা মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
চাকরি ও লাইসেন্স বাণিজ্য: সরকারি চাকরি দেওয়া এবং বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাকে সরকারি নিবন্ধন বা লাইসেন্স করিয়ে দেওয়ার নাম করে প্রান্তিক ও অসহায় মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে লাখ লাখ টাকা।
নীরব প্রশাসন: দায় এড়াতে পারেন না ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা
একটি উপজেলার সাধারণ একজন কম্পিউটার অপারেটর দিনের পর দিন সরকারি কর্মকর্তার নাম ভাঙিয়ে এই চাঁদাবাজি ও অরাজকতা কীভাবে চালিয়ে যাচ্ছে, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয় এক ভুক্তভোগী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “অফিসের সাধারণ একজন কম্পিউটার অপারেটর যখন বাঘের মতো গর্জন করে বেড়ায়, তখন বুঝতে হবে খাঁচার দরজাটা উপর থেকে কেউ খুলে রেখেছে। তাদের এই দুর্নীতির দায়ভার পরোক্ষভাবে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ওপরও বর্তায়। সাধারণ মানুষ তো মান-ইজ্জতের ভয়ে মুখ খোলে না।”
অভিযুক্ত ও প্রশাসনের বক্তব্য
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত কম্পিউটার অপারেটর শামীম হোসেনের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি তা রিসিভ করেননি। অন্যদিকে, ধামরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার পক্ষ থেকেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। ফলে তাদের সুনির্দিষ্ট বক্তব্য প্রতিবেদনে যুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
জরুরি বিভাগীয় তদন্ত ও দুদকের হস্তক্ষেপ দাবি
নতুন বাংলাদেশে যেখানে প্রতিটি সরকারি দপ্তরকে দুর্নীতিমুক্ত করার শপথ নেওয়া হয়েছে, সেখানে ধামরাই ইউএনও অফিসের এই জিম্মিদশা ভাঙতে অবিলম্বে দরকার কঠিন আইনি ব্যবস্থা। এলাকাবাসীর দাবি—শামীম ও তার সহযোগী সিন্ডিকেট সদস্যদের অবিলম্বে কর্মস্থল থেকে সাময়িক বরখাস্ত করে বিভাগীয় মামলা দায়ের করতে হবে। একই সাথে গত ১০ বছরে অর্জিত অবৈধ সম্পদের খোঁজে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও গোয়েন্দা সংস্থার (NSI/DGFI) জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
লুটপাট ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে রক্ত দেওয়া জুলাইয়ের শহীদদের রক্তের সাথে শামীম ও তার চক্রের এমন বেপরোয়া আচরণ চরম বেইমানি। ধামরাইয়ের সাধারণ মানুষ এখন অধীর আগ্রহে চেয়ে আছে—প্রশাসন কবে এই রাঘববোয়াল ও তার সহযোগীদের মুখোশ টেনে ছিঁড়ে আইনের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
(ধামরাই ইউএনও অফিসের এই দুর্নীতিবাজ চক্রের ক্ষমতার উৎসের খোঁজে আমাদের অনুসন্ধান চলমান। চোখ রাখুন পরবর্তী পর্বে…
— অপরাধ উন্মোচন প্রতিবেদন
আপনার প্রতিক্রিয়া কী?
মোট ০ প্রতিক্রিয়াপ্রতিক্রিয়া জানাতে সাইন ইন করুন।
দিনের সেরা সংবাদ ইমেইলে পান
যেকোনো সময় ১-ক্লিকে আনসাবস্ক্রাইব করতে পারবেন।

মন্তব্য (০)
মন্তব্য করতে সাইন ইন প্রয়োজন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনি করুন।